Bhakti Shastri Answer : উপদেশামৃত
প্রশ্নঃ ইন্দ্রিয়ের বেগগুলিকে কিভাবে আপনি দমন করতে পারবেন, তা আলােচনা করুন। শ্ৰী উপদেশামৃতের ১ নং শ্লোক থেকে সংস্কৃত শব্দ ও উপমা উদ্ধৃতি দিন।
উত্তরঃ
ইন্দ্রিয়ের ছয়টি বেগের আমার জীবনে প্রভাব :
বাক্যের বেগ :
১) আমি প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় কথা বলে ফেলি যার কোনো মূল্য নেই।
২) আমি কখনো কখনো আমার পরিচিতদের অনেক কটূ বাক্য বলে ফেলি।
৩) আমি অকারণে আমার পিতামাতাকে অপ্রীতিকর শব্দ বলে ফেলি।
ক্রোধের বেগ :
১) আমাকে কেউ অপমান জনক কথা বললে আমি খুব সহজেই ক্রোধিত হয়ে পরি।
২) আমার কথা অনুযায়ী কাজ না হলে আমি ক্রোধিত হয়ে পরি।
৩) আমার মনের ইচ্ছা পূরণ না হলে আমি ক্রোধিত হয়ে পরি।
জিহ্বার বেগ :
১) আমার বেশিরভাগ সময় সুস্বাদু খাবার খেতে ইচ্ছা করে।
২) অনেক সময় যা প্রসাদ নয় যেমন দোকানের মিষ্টি ইত্যাদি খেয়ে ফেলি।
৩) যেগুলি স্বাস্থ্যের অনুকূল নয় যেমন ম্যাগি, চাওমিন ইত্যাদি অত্যাধিক পরিমানে খেয়ে ফেলি।
মনের বেগ :
১) আমি মাঝে মধ্যেই অপ্রয়োজনীয় কথা চিন্তা করে সময় নষ্ট করি।
২) অনেক সময় অবাস্তব ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি।
৩) অনেক দুর্লভ বস্তু প্রাপ্ত করার কথা ভাবতে থাকি।
উদরের বেগ :
১) আমি রাত্রি বেলা মাঝে মাঝে অত্যাধিক আহার গ্রহণ করি যা ভোরে ওঠাতে বাধা দেয়।
২) আমি কখনো কখনো নির্দিষ্ট সময় ব্যতিরেকে চার পাঁচ বার আহার গ্রহণ করি।
উপস্থের বেগ :
১) সঙ্গের প্রভাবে কখনও কখনও বিকৃত চেতনার উদ্ভব হয়।
১ নং শ্লোকের অনুবাদ ও তাৎপর্য থেকে উদ্ধৃতি :
১) বাচঃ -বাক্যের বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''মাঠের ব্যাঙ যেমন বিরক্তিকর আওয়াজ করে চলে, সেই রকম আমাদের জিভ থাকার জন্য আমরাও কথা বলে চলি। কিন্তু যা বলি তা সবই বাজে কথা। ব্যাঙের বিরক্তিকর আওয়াজ শুধু তার মৃত্যুরপী সাপকে ডেকে আনে। যদিও এই আওয়াজ তার মৃত্যুকে ডেকে আনে, তবুও ব্যাঙ সেই আওয়াজ করেই চলে। বিষয়ী এবং নির্বিশেষবাদী, মায়াবাদী দার্শনিকদের এই রকম ব্যাঙের সঙ্গে তুলনা করা চলে। তারা সব সময় অযথা কথা বলে এবং এইভাবে তাদের মৃত্যুকে ডেকে আনে। তবে বাক্-সংযম অর্থে স্বতঃপ্রণােদিত মেীন অবলম্বন নয়, যা মায়াবাদী দার্শনিকেরা করে থাকেন।''
২) মনসঃ- মনের বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে মন অর্পণ করতে পারলেই মনােবেগ বা চঞ্চল মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।'' ''মন ভাবনাহীন থাকতে পারে না। ভাবনাশূন্য করা একটা কৃত্রিম পন্থা। তবে কৃষঃচিন্তা করে, কৃষ্ণসেবার কথা চিন্তা করে মনকে সংযত করা যায়। "
৩) ক্রোধ- ক্রোধের বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''ক্রোধবো সংযত করা যায় না। কিন্তু উপযুক্ত ক্ষেত্রে তা প্রয়ােগ করা যায়। ক্রোধের বলেই পবনপুত্র হনুমান লঙ্কায় আগুন ধরিয়ে দেন। এইভাবে তিনি আজও ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত হিসাবে জগৎ-পুজ্য। এই ভাবে হনুমান তাঁর ক্রোধের যথাযােগ্য ব্যবহার করেন। অর্জুনও তাই করেছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করেননি, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণই অর্জুনের ক্রোধাগ্নি জ্বালিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যুদ্ধ তােমায় করতেই হবে।” ক্রোধ ছাড়া যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, তাই ক্রোধবেগ জয় করা সম্ভব একমাত্র কৃষ্ণসেবায় তা প্রয়ােগ করার মাধ্যমে।''
৪) জিহ্বা- জিহ্বার বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''আমরা সবাই জিহ্বাবেগ অনুভব করি। জিহ্বা সব সময় মুখরােচক খাবার খাওয়ার জন্য উৎসুক। সাধারণত জিহ্বার আসক্তি অনুযায়ী আমাদের খাবার খাওয়া উচিত নয়, বরং জিহ্বা দিয়ে প্রসাদ খেয়ে জিহ্বাকে সংযত করা উচিত। শুধুমাত্র কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণ করাই ভক্তের একমাত্র কর্তব্য। নিয়মিত সময়ে প্রসাদ গ্রহণ করা উচিত। জিহ্বার তাড়নায় দোকানে তৈরি কোন খাবার বা মিষ্টি খাওয়া উচিত নয়। যদি আমরা সংকল্প করে শুধু কৃষ্ণ প্রসাদই গ্রহণ করি এবং তা পালন করি, তা হলে আমরা উদরবেগ ও জিহ্বাবেগ জয় করতে পারি।''
৫) উদর- উদরের বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''যদি শুধু কৃষ্ণপ্রসাদই খাবার হিসাবে গ্রহণ করা হয় তা হলে মায়ার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। শাক-সবজি, শস্য, ফল মুল, দুধ, জল দিয়ে যে খাবার তৈরি হয় ভগবান নিজে সেই সব আহার্য হিসাবে অনুমােদন করেন। শুধু সুস্বাদুতার জন্য কেউ যদি অতিরিক্ত প্রসাদ খায় তবে তাও ইন্দ্রিয়-তর্পণ বলে বিবেচিত হয়। তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অত্যন্ত মুখরােচক প্রসাদ গ্রহণেও বিরত হতে বলেছেন। আবার ভগবানকে নিবেদন করার অছিলায় নিজ ইন্দ্রিয় রসনা তৃপ্তির জন্য যদি অতি সুস্বাদ ভােগান্ন তৈরি করা হয়, তবে তাও জিহ্বাবেগ তাড়নার কারণ বলে গণ্য হয়। ধনী গৃহে ভাল ভাল খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ গ্রহণ করাও জিহ্বার তৃপ্তি বলে বিবেচিত হয়।'' ''অতিরিক্ত খাওয়ার লালসা আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তােলে। একাদশী, জন্মাষ্টমী ও অন্যান্য বৈষ্ণব-তিথিগুলিতে উপবাস করে আমরা উদরবেগ সংযত করতে পারি।''
৬) উপস্থ- উপস্থের বেগ। শ্রীল প্রভুপাদ এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যে বলেছেন ''উপস্থবেগ সম্বন্ধে বলা যায় যৌনসঙ্গম দুই রকম—একটি বৈধ এবং অপরটি অবৈধ। উপযুক্ত বা যোগ্য ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিধিসম্মতভাবে বিবাহ করতে পারে ও সুসন্তান লাভের জন্য যৌনসঙ্গম করতে পারে। তা যেমন আইনানুগ, তেমনই শাস্ত্রসম্মত। অন্যথায় যৌনতৃপ্তির জন্য মানুষ কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করবে, অসংযত ভাবে যৌন উপভােগ করবে। কৃত্রিম উপায়ে যৌন সঙ্গম, অস্বাভাবিকভাবে যৌন সঙ্গম, যৌনকথা আলােচনা, যৌন চিন্তা বা স্ত্রীসঙ্গ কামনা ইত্যাদিকে শাস্ত্রে অবৈধ যৌন জীবন বলা হয়। এইভাবে যৌন জীবন যাপন করার ফলে মানুষ মায়াবদ্ধ হয়।''
ইন্দ্রিয়ের বেগ গুলি কিভাবে আমি দমন করতে পারবো তা নিচে বর্ণনা করা হলো :
১) বাক্যের বেগ : অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে শুধুমাত্র কৃষ্ণকথা আলোচনা এবং প্রচার করার মাধ্যমে আমি আমার বাক্যের বেগ দমন করতে পারবো।
২) মনের বেগ : কৃষ্ণ লীলা স্মরণ ও কৃষ্ণের সেবা করার কথা চিন্তা করার মাধ্যমে আমি আমার মনের বেগ দমন করতে পারবো।
৩) ক্রোধের বেগ : অযথা ক্রোধকে প্রশ্রয় না দিয়ে শুধুমাত্র ভগবৎ বিরোধী কথা বা কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ক্রোধ প্রকাশ করার মাধ্যমে আমি আমার ক্রোধের বেগ দমন করতে পারবো।
৪) জিহ্বার বেগ : শুধুমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করার মাধ্যমে আমি আমার জিহ্বার বেগ দমন করতে পারবো।
৫) উদরের বেগ : প্রয়োজন অতিরিক্ত প্রসাদ না গ্রহণ করার মাধ্যমে এবং একাদশী, জন্মাষ্টমী আদি তিথি গুলিতে উপবাস করার মাধ্যমে আমি আমার উদরের বেগ দমন করতে পারবো।
৬) উপস্থের বেগ : অসৎ অবৈধ সঙ্গের প্রতি আসক্ত না হয়ে এবং বৈধ শাস্ত্রসম্মত ভাবে বিবাহ করার পর শুধুমাত্র কৃষ্ণভক্ত সন্তান উৎপাদন করার মাধ্যমে আমি আমার উপস্থের বেগ দমন করতে পারবো।
উপসংহারঃ শ্রীল রূপ গোস্বামীর শ্রীউপদেশামৃতের ১নং শ্লোক থেকে আমরা জানতে পারি যে আমাদের ইন্দ্রিয়ের ছয় প্রকারের বেগ গুলি দমন করা উচিত এবং এর ফলে আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে উঠতে পারবো।