Bhakti Shastri Answer : ভগবদগীতা (4)
প্রশ্ন:- যথাযথ ভাবে ব্যাখ্যা করুন কিভাবে কৃষ্ণভক্তি অতি সহজেই করা সম্ভব ৯.২৬ শ্লোক এবং তাৎপর্য থেকে প্রমাণ উদ্ধৃত করুন।
উত্তর:-
বিষয় :- আলোচ্য বিষয় হল কেন কৃষ্ণ ভক্তির পথ অত্যন্ত সহজ।
ভূমিকা : কৃষ্ণ ভক্তির পথ অতি সহজ ও সরল। কিন্তু সকাম কর্ম যোগ, জ্ঞান যোগ, অষ্টাঙ্গ যোগ, ইত্যাদি পন্থা গুলি এই বর্তমান যুগে পালন করা সম্ভব নয়। এ সম্বন্ধে নিচে বিস্তৃত ভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
ব্যাখ্যা :-
সকাম কর্ম :
সকাম কর্মের পথ অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। বেদে বর্ণিত কর্মকাণ্ডীয় যজ্ঞানুষ্ঠান করার জন্য বহুবিধ আয়োজন ও উপকরণের প্রয়োজন। যা বর্তমান সময়ে সহজলভ্য় নয়। যেমন বিশুদ্ধ ঘি ইত্যাদি। এছাড়াও যজ্ঞ সম্পাদনকারী সদাচারী ব্রাহ্মণ খুঁজে পাওয়াও দুর্লভ। তাই সঠিকভাবে পূজা ও যজ্ঞ সম্পাদন না হবার ফলে দেবদেবীরা সন্তুষ্ট হন না বরং তাঁদের প্রতি অপরাধ হয়। তাই সকাম কর্ম আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সকাম কর্মের মাধ্যমে যে পুণ্য লাভ হয় তার ফলে আমরা উচ্চতর লোকে গিয়ে ভোগ ঐশ্বর্যের মধ্যে জীবন যাপন করতে পারি। কিন্তু পুণ্য ক্ষয় হলে পুনরায় এই জগতে ফিরে আসতে হয়।তাই সকাম কর্মের ফল নিত্য নয়।
অষ্টাঙ্গ যোগ :
অষ্টাঙ্গ যোগ অর্থাৎ যোগের আটটি অঙ্গকে বোঝায়। যেগুলি হলো যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান, সমাধি। বর্তমানে অষ্টাঙ্গ এর পথ অনুসরণ করা অসম্ভব। অষ্টাঙ্গ যোগ পালন করার জন্য কোনো নির্জন স্থানে বসবাস করা প্রয়োজন। যা সম্ভব নয়, কারণ কলিযুগে এরকম স্থান খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। এছাড়া কলিযুগে আমাদের সহ্যশক্তি অত্যন্ত কম, তাই নির্জন স্থানে বসবাস করলে আমাদের শারীরিক চাহিদা গুলি পূরণ না হবার ফলে আমরা নিমেষে প্রাণ ত্যাগ করব। তাছাড়া ধ্যানের মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। যা অর্জুন দ্বাপর যুগে করতে অক্ষম ছিল, আর এই কলিযুগে সেটি করা একেবারেই অসম্ভব।
জ্ঞান যোগ:
জ্ঞান যোগের পথ অত্যন্ত দুরসাদ্ধ। এই পন্থা অনুযায়ী বিভিন্ন জল্পনা কল্পনার মাধ্যমে বুঝতে হয় কোনটি ব্রহ্ম আর কোনটি ব্রহ্ম নয়। যেমন আমি আমার শরীর নই, আমি মন নই ইত্যাদি। অর্থাৎ এটি হলো 'নেতি নেতি' পন্থা। এছাড়াও এই পথ অনুসরণ করার জন্য অগাধ পান্ডিত্যের প্রয়োজন। যার দ্বারা বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করা যায়। তাই বর্তমানে এই পদ্ধতি অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই অপ্রযোজ্য।
কৃষ্ণ ভক্তি:
কৃষ্ণ ভক্তির পথ অতীব সরল। ভগবৎ গীতার ৯.২৬ শ্লোকে বলা হয়েছে শুধুমাত্র পত্র, ফুল, ফল ও জল ভক্তি সহকারে অর্পণ করলেই পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সন্তুষ্ট হন। এ থেকে বোঝা যায় ধনী অথবা দরিদ্র যে কেউ ভক্তি করতে পারেন। আমরা ভাগবতম থেকে জানতে পারি দরিদ্র সুদামার কাছ থেকে সামান্য ক্ষুদ পেয়েও ভগবান খুশি হয়েছিলেন। বিদুরাণীর প্রদত্ত কলার খোসাতেও তিঁনি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন অথচ দুর্যোধনের রাজভোগ তিঁনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় ভগবান সারগ্রাহী অর্থাৎ তিনি শুধুমাত্র আমাদের ভক্তিভাব গ্রহণ করেন। কৃষ্ণ ভক্তি যেকেউ করতে পারে এমনকি পশুদেহে থেকেও করা যায়। যেমন গজেন্দ্র হাতির শরীরে থেকেও তিনি মোক্ষ লাভ করেন। হনুমান বাঁদর কূলের অন্তর্ভুক্ত হলেও তিনি ছিলেন ভগবান রামের সর্বাধিক প্রিয় সেবক। ভগবানকে যেকোনো পরিস্থিতিতে স্মরণ করা যায়। যেমন কুন্তী দেবী অত্যন্ত প্রতিকূল সময়েও ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতেন। ভগবান গীতাতে বলেছেন তিনি জলের স্বাদ তাই জল পান করার সময়েও ভগবান কে স্মরণ করা যায় , সূর্য ও চন্দ্র তাঁর দুই চক্ষু তাই এগুলি দেখামাত্র ভগবান কে স্মরণ করা যায়। চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন ''নিয়মিত স্মরণে না কালঃ'' অর্থাৎ ভগবান কে স্মরণ করার কোনো নির্দিষ্ট সময় বা নিয়ম নেই। কৃষ্ণভক্তি গৃহে অথবা বনে যেকোনো জায়গায় করা যায়। কৃষ্ণভক্তির জন্য অগাধ পান্ডিত্যের প্রয়োজন নেই।
উপসংহার:-
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে সকাম কর্মযোগ , অষ্টাঙ্গ যোগ বা জ্ঞান যোগ এগুলির কোনোটিই বর্তমান কলিযুগে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তির পথ অত্যন্ত সহজ ও সরল হবার কারণে আমরা এই পথ অনুসরণ করে আমাদের চরম লক্ষে পৌঁছতে পারি। অর্থাৎ ভগবত ধাম লাভ করতে পারি।