Bhakti Shastri Answer : ভক্তিরসামৃতসিন্ধু
প্রশ্ন (২): সাধনা ভক্তির ৬৪ টি অঙ্গের মধ্যে কোনগুলি অনুশীলন আপনি উন্নত করতে পারবেন। সাধনা ভক্তির এই ক্ষেত্রগুলির উন্নতি আপনার কৃষ্ণভাবনায় কিভাবে সাহায্য করবে তা আলোচনা করুন।
উত্তরঃ
ভূমিকা: শ্রীল রূপ গোস্বামী তাঁর বিরচিত ভক্তি রসামৃত সিন্ধু গ্রন্থে সাধনা ভক্তির ৬৪ টি অঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সাধনা ভক্তির ৬৪ টি অঙ্গ আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ভাগ
সাধনাভক্তির ৬৪ টি অঙ্গের মধ্যে নিম্নলিখিত গুলির অনুশীলন আমি উন্নত করতে পারব --
১) সদগুরুর চরণাশ্রয়
২) সদগুরুর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ ও তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ
৩) শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সহকারে গুরু সেবা
৪) মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ
৫) পুণ্যভূমিতে বাস
৬) একাদশী ব্রত পালন
৭) কোনো জীবকে ক্লেশ না দেওয়া
৮) তিলক ও তুলসী মালা ধারণ
৯) শ্রীবিগ্রহকে সম্মান সহকারে দণ্ডবৎ প্রণাম
১০) মন্দির পরিক্রমা
১১) বিষ্ণু মন্দির অথবা তীর্থে গমন
১২) শ্রীবিগ্রহের অর্চনা
১৩) বৈষ্ণব সেবা
১৪) সংকীর্তন
১৫) জপ
১৬) প্রসাদ সেবন
১৭) ভাগবত শ্রবণ
১৮) ভগবানের লীলাবিলাসের মহোৎসব পালন
১৯) তুলসী মহারাণী সেবা
২০) ধাম বাস
দ্বিতীয় ভাগ
সাধনা ভক্তির এই অঙ্গগুলি আমার কৃষ্ণভাবনায় কিভাবে সাহায্য করবে তা নিম্নলিখিত ভাবে বর্ণনা করা হল--
১) সদগুরুর চরণাশ্রয় :
যে মানুষ যথার্থ সুখ লাভের জন্য ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী, তাকে অবশ্যই একজন সদ্গুরুর অন্বেষণ করতে হবে এবং তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে তার চরণাশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। যথার্থ সদগুরু হচ্ছেন তিনি, যিনি স্বয়ং যুক্তি ও তর্কের দ্বারা শাস্ত্রের সিদ্ধান্তে নিম্নত এবং যিনি অপরকে সেই সিদ্ধান্তে প্রত্যয় উৎপাদন করতে সমর্থ। যিনি সব রকম জাগতিক কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হয়েছেন, সেই মহাপুরুষই যথার্থ সদগুরু।
আমি সদগুরুর চরণাশ্রয় লাভ করেছি, গুরুদেবের চরণে আমি প্রার্থনা জানাই তিনি যেন আমাকে তাঁর সেবায় সর্বদা নিযুক্ত করেন।
২) সদগুরুর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ ও তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ :
শিষ্যের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীগুরুদেবকে পরমেশ্বর ভগবান বলে মনে করা, কেননা তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের বাহ্য প্রকাশ। শিষ্যের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীগুরুদেবের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সর্বক্ষণ সচেষ্ট থাকা। তা হলে তার পক্ষে দিব্যজ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত সুলভ হবে। শিষ্যের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীগুরুদেবের তত্ত্বাবধানে গভীর নিষ্ঠা সহকারে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করা উচিত। শ্রীগুরুদেব ও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি যিনি অবিচলিতভাবে শ্রদ্ধাপরায়ণ, তার হৃদয়ে সমস্ত তত্ত্ব আপনা থেকেই অনায়াসে স্ফুরিত হয়।
গুরুদেবের অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে আমি দীক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছি এবং তাঁর রচিত গ্রন্থ ও প্রদত্ত প্রবচনের মাধ্যমে আমি শিক্ষা লাভ করছি।
৩) শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সহকারে গুরু সেবা :
শ্রীগুরুদেবের কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্তি সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধে (১১/১৭/২৭) শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, “প্রিয় উদ্ধব। শ্রীগুরুদেবকে কেবল আমার প্রতিনিধি বলেই মনে করা উচিত নয়, পরন্তু তাকে আমার স্বরূপ বলে জানবে। কখনও তাকে অবজ্ঞা করবে না এবং তাকে একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে করবে না। একজন সাধারণ মানুষের প্রতি মানুষ যেমন ঈর্ষাপরায়ণ হয়, গুরুদেবের প্রতি কখনও সেইভাবে ঈর্ষাপরায়ণ হওয়া উচিত নয়। শুরুতে সর্বদেবতার অধিষ্ঠান বলে জানবে, এবং তাই গুরুদেবকে সেবা করার ফলে সমস্ত দেবতাদের সেবা করা হয়।”
আমি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সহকারে গুরুদেবের সেবা ও তাঁর প্রতিটি নির্দেশ পালন করবো।
৪) মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ :
ভক্তের কর্তব্য হচ্ছে পূর্বতন আচার্য ও মহাত্মাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। কারণ তাদের অনুসরণ করার ফলে অভীষ্ট সিদ্ধ হয় এবং তখন আর বিভ্রান্ত হয়ে শােকগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কেউ যদি শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে আচরণ না করে মহান ভক্ত হওয়ার অভিনয় করে, তা হলে সে কখনও ভগবদ্ভক্তির পথে উন্নতি সাধন করতে পারে না। পক্ষান্তরে, সে কেবল ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী সাধক-ভক্তদের সাধন-মার্গে উৎপাতের সৃষ্টি করে।
পূর্বতন আচার্যদের প্রদত্ত নির্দেশ পালন করার মাধ্যমে আমি তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবো।
৫) পুণ্যভূমিতে বাস :
গঙ্গার জল সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে অর্পিত তুলসীর সৌরভ বহন করছে এবং এইভাবে গঙ্গার জল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা প্রচার করে প্রবাহিত হচ্ছে। যেখানেই গঙ্গার জল প্রবাহিত হচ্ছে, সেখানে সব কিছুই বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণভাবে পবিত্র হয়ে যায়।
আমি সর্বদা সত্ত্বগুণ প্রভাবিত এলাকায় বসবাস করার চেষ্টা করবো। রজোগুণ ও তমোগুণ প্রভাবিত এলাকা পরিত্যাগ করব।
৬) একাদশী ব্রত পালন :
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বলা হয়েছে যে, একাদশীর দিন উপবাস করলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আত্যন্তিক পুণ্য লাভ করা যায়। একাদশীর দিন উপবাস করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে গােবিন্দ বা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অধিক শ্রদ্ধা ও প্রেমপরায়ণ হওয়া। একাদশীর দিন উপবাস করার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, শারীরিক আবশ্যকতাগুলি খর্ব করে ভগবানের মহিমা কীর্তন এবং অন্যভাবে ভগবানের সেবা করে সময়ের সদ্ব্যবহার করা। উপবাসের দিন নিরন্তর গােবিন্দের লীলা স্মরণ এবং তাঁর দিব্য নাম শ্রবণ করাই হচ্ছে সর্বোত্তম।
আমি একাদশী ব্রত পালন করি এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি নিষ্ঠা সহকারে একাদশী ব্রত পালন করবো।
৭) কোনো জীবকে ক্লেশ না দেওয়া :
মহাভারতে বলা হয়েছে—“যে মানুষ অন্য কোন জীবকে উত্ত্যক্ত করে না অথবা ক্লেশ দেয় না, যিনি সকলকে পুত্রবৎ দর্শন করেন, যার হৃদয় নির্মল, তিনি অচিরেই পরমেশ্বর ভগবানের কৃপা লাভ করেন।” আজকের তথাকথিত সভ্য-সমাজে কখনও কখনও পশুহিংসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, কিন্তু কসাইখানাগুলিতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নিরীহ পশু হত্যা হচ্ছে। বৈষ্ণবের মনােভাব সেই রকম নয়। বৈষ্ণব কখনও পশুহত্যা বরদাস্ত করেন না এবং তিনি কখনই কাউকে কোন রকম ক্লেশ দেন না।
আমি কখনো কখনো কটূ কথা বলে ফেলি যা অন্যকে ক্লেশ প্রদান করে, আমি চেষ্টা করবো এই ধরণের কথা বলা থেকে বিরত থাকার।
৮) তিলক ও তুলসী মালা ধারণ :
স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে, “যিনি তিলক অথবা গােপীচন্দনের দ্বারা বিভূষিত হয়ে সমস্ত শরীরে ভগবানের নাম ধারণ করেন এবং যাঁর কণ্ঠে ও বক্ষঃস্থলে তুলসীমালা থাকে, সেই বৈষ্ণবদের কাছে যমদূত আসতে পারে না।” পদ্ম-পুরাণেও বলা হয়েছে, “যে মানুষের শরীর চন্দন ও ভগবানের দিব্য নামের দ্বারা বিভূষিত, তিনি সব রকম পাপ থেকে মুক্ত হয়েছে, এবং তার মৃত্যুর পর তিনি পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গলাভ করার জন্য কৃষ্ণলােকে প্রবিষ্ট হন।
আমি প্রতিদিন স্নান করে তিলক ধারণ করি। এবং তুলসী মালা সর্বদা ধারণ করে থাকি।
৯) শ্রীবিগ্রহকে সম্মান সহকারে দণ্ডবৎ প্রণাম :
যে মানুষ বহু যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছেন, তিনি পুণ্যফল লাভ করবেন। কিন্তু সেই সমস্ত পুণ্যের ফল যখন শেষ হয়ে যায়, তখন তাকে আবার এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হয়, কিন্তু যে মানুষ কেবল একবার শ্রদ্ধা সহকারে ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে প্রণতি নিবেদন করেছে, তাকে আর কখনও এই জগতে ফিরে আসতে হবে না, কেন না তিনি সরাসরিভাবে কৃষ্ণলােকে উন্নীত হবেন।
আমি প্রতিদিন ভক্তি সহকারে শ্রীবিগ্রহকে প্রণাম করি।
১০) মন্দির পরিক্রমা :
হরিভক্তি-সুবোদয়ে বলা হয়েছে, "যে মানুষ বিষ্ণুমূর্তির পরিক্রমা করেন, তিনি এই জড় জগতে জন্ম-মৃত্যুর চক্রকে প্রতিহত করে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হন।" পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, "চাতুর মাস্যের সময়, কেউ যদি অন্তত চারবার বিষ্ণুমন্দির প্রদক্ষিণ করেন, তা হলে বুঝতে হবে, তিনি সমস্ত ব্রহ্মান্ড ভ্রমণ করেছেন।"
আমি ধামে গিয়ে মন্দির পরিক্রমা করি।
১১) বিষ্ণু মন্দির অথবা তীর্থে গমন :
বৃন্দাবন, মথুরা, দ্বারকা আদি পুণ্যভূমিতে যারা গমন করেছেন, তারা ধন্য। তারা অনায়াসে সংসাররূপ মরুভূমি পার হয়ে যান। শাস্ত্রে জড় জগতের দুঃখময় অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য প্রত্যেককে ভক্তি সহকারে ভগবানের মন্দিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার ফলে অনায়াসে এই জড় জগতের দুঃখময় পুনর্জন্ম থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আমি পরিবার সহ বিভিন্ন সময়ে তীর্থে গমন করি।
১২) শ্রীবিগ্রহের অর্চনা :
অর্চনা মানে মন্দিরে ভগবানের শ্রীবিগ্রহের পূজা করা। ভক্তির এই অঙ্গ অনুশীলন করার ফলে বুঝতে পারা যায় যে, আমরা এই শরীর নই, আমাদের স্বরূপে আমরা চিন্ময় আত্মা। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে (১০/৮১/১৯) বর্ণনা করা হয়েছে যে, কৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সখা সুদামা ব্রাহ্মণদের গৃহে গিয়ে স্বগতােক্তি করে বলেছিলেন “কেবলমাত্র কৃষ্ণের অর্চনা করার ফলে অনায়াসে স্বর্গের সমস্ত ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হওয়া যায়, মােক্ষলাভ করা যায়, এই ব্রহ্মাণ্ডের সার্বভৌমত্ব লাভ করা যায়। "
আমি প্রতিদিন শ্রীবিগ্রহকে তুলসী পত্র অর্পণ করি এবং অধিকাংশ দিনে অর্চনা করি।
১৩) বৈষ্ণব সেবা :
পদ্ম-পুরাণে দেবাদিদেব মহাদেব পার্বতীকে বলেছে, “হে দেবী! সমস্ত আরাধনার মধ্যে ভগবানের আরাধনাই হচ্ছে সর্বোত্তম। কিন্তু ভগবদ্ভক্তের আরাধনা তার থেকেও বড়। শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে (৩/৭/১৯) বলা হয়েছে, “আমি কেবল ভগবদ্ভক্তের নিষ্কপট দাস হবার আকাক্ষা করি, কেন না তাদের সেবা করার ফলে ভগবানের চরণারবিন্দে শুদ্ধ ভক্তি অনায়াসে লাভ করা যায়। ভক্তসেবার ফলে সব রকম জড়জাগতিক ক্লেশ বিনষ্ট হয়, এবং পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ঐকান্তিক ভক্তি লাভ করা যায়।”
আমি পরিবারসহ বৈষ্ণব সেবা করতে ভালোবাসি।
১৪) সংকীর্তন :
কেউ যদি উচ্চৈঃস্বরে ভগবানের লীলা, গুণ, রূপ আদির মহিমা কীর্তন করেন, তাকে বলা হয় সংকীর্তন। সংকীর্তন বলতে সমবেতভাবে ভগবানের দিব্য নাম কীর্তনকে বােঝায়। বিষ্ণুধর্মে এই সংকীর্তনের মহিমা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “এই কৃষ্ণনাম এতই পবিত্র যে, এই নাম কীর্তনের ফলে তৎক্ষণাৎ জন্ম-জন্মান্তরের পুঞ্জীভূত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।” চৈতন্যচরিতামৃতে উল্লেখ করা হয়েছে, “কেউ যদি একবার মাত্র কৃষ্ণনাম উচ্চারণ করেন, তা হলে তার এত পাপ নাশ হয় যে, তত পাপ করার সাধ্য কোন পাপীর নেই।”
আমি হরিনাম সংকীর্তনে যোগদান করি যেমন কীর্তন মেলা।
১৫) জপ :
মৃদুমন্দ স্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করাকে বলা হয় জপ। যেমন, 'হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে,' এই মহামন্ত্র যখন নিজের শোনার জন্য আস্তে আস্তে উচ্চারণ করা হয় তখন তাকে বলা হয় জপ। পদ্ম-পুরাণে বলা হয়েছে, “যে মানুষ ভগবানের দিব্য নাম জপ অথবা কীর্তন করেন, তার কাছে স্বর্গসুখ ও মােক্ষ লাভের পন্থা তৎক্ষণাৎ উন্মুক্ত হয়।"
আমি প্রতিদিন ১৬ মালা জপ করি এবং একাদশীতে ২৫ মালা জপ করি।
১৬) প্রসাদ সেবন :
পদ্ম-পুরাণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “ভগবানের শ্রীবিগ্রহ থেকে একটু দূরে গিয়ে যে মানুষ তুলসী ও চরণামৃতযুক্ত ভগবানের প্রসাদ নিয়মিত সেবন করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ কোটি কোটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার পুণ্য অর্জন করেন।
আমি প্রতিদিন প্রসাদ সেবন করি।
১৭) ভাগবত শ্রবণ :
স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে, “যে মানুষ নিরন্তর বৈষ্ণব শাস্ত্র পাঠ করেন এবং শ্রবণ করেন, তিনি ধন্য এবং নিঃসন্দেহে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার প্রতি প্রসন্ন হন। যে মানুষ অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই সমস্ত গ্রন্থ গৃহে রাখেন এবং তাঁদের প্রতি প্রণতি নিবেদন করেন, তিনি সব রকমের পাপ থেকে মুক্ত হন এবং পরিণামে দেবতাদেরও আরাধ্য হন। নারদ মুনিকে বলা হয়েছে, “হে নারদ! যে মানুষ বৈষ্ণব শাস্ত্র লিপিবদ্ধ করে ঘরে রাখেন, তার গৃহে সাক্ষাৎ নারায়ণ সর্বক্ষণ বিরাজ করেন।”
আমি বাড়িতে প্রতিদিন ভাগবত কথা শ্রবণ করি ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এবং ধামে গিয়ে সাধু সঙ্গে বসে ভাগবত কথা শ্রবণ করি ।
১৮) ভগবানের লীলাবিলাসের মহোৎসব পালন :
শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী, রামনবমী, মহান বৈষ্ণবদের জন্মতিথি, ঝুলনযাত্রা, দোলযাত্রা আদি বিভিন্ন উৎসবের অনুষ্ঠান করা উচিত। ভগবানের উৎসবের দিনগুলিতে রথে করে ভগবানকে নিয়ে শােভাযাত্রা বার করা হয়, যার ফলে মানুষ অনায়াসে ভগবানের দর্শন লাভ করতে পারে। ভবিষ্য-পুরাণে বলা হয়েছে "এই সমস্ত উৎসবের দিনে যদি কোন চণ্ডালও (যে মানুষ কুকুরের মাংস আহার করে) কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে রথে উপবিষ্ট ভগবানকে দর্শন করে, তা হলে সেও বিষ্ণুর পার্ষদত্ব লাভ করে।”
আমি বাড়িতে জন্মাষ্টমী, গৌড় পূর্ণিমা ইত্যাদি পালন করি এবং ধামে গিয়ে এই মহোৎসব গুলিতে যোগদান করি।
১৯) তুলসী মহারাণী সেবা :
স্কন্দপুরাণে তুলসীর মহিমা কীর্তন করে বলা হয়েছে, “যাঁর দর্শনে পাপ ও রােগ নাশ হয়, স্পর্শের ফলে শরীর শুদ্ধ হয়, জল সিঞ্চন করার ফলে ভয় দূর হয়, রােপণ করার ফলে ভগবদ্ভক্তি লাভ হয় এবং শ্রীকৃষ্ণের চরণে অর্পণ করার ফলে পূর্ণ ভগবৎ-প্রেম লাভ করা যায়, সেই তুলসী দেবীর চরণে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।” স্কন্দপুরাণে আর একটি শ্লোকে তুলসীর মহিমা বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “তুলসী সর্বমঙ্গলময়ী। তাকে দর্শন করলে, স্পর্শ করলে, স্তবন করলে, বন্দনা করলে, তার মহিমা শ্রবণ করলে অথবা রােপণ করলে সব রকমের কল্যাণ লাভ করা যায়। এই প্রকার নয়টি বিধির মাধ্যমে তুলসী দেবীর সেবা করলে নিত্যকাল বৈকুণ্ঠ জগতে বাস করা যায়।”
আমি প্রতিদিন তুলসী মহারানীকে জল সিঞ্চন করি এবং প্রতিদিন তুলসী আরতি করি।
২০) ধাম বাস :
পদ্ম-পুরাণে মথুরা, দ্বারকা আদি পুণ্যক্ষেত্রে বাস করার গুরুত্ব বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “বিভিন্ন তীর্থে ভ্রমণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু এই মুক্তি পরম সিদ্ধি নয়। মুক্ত হওয়ার পর ভগবানের সেবায় যুক্ত হতে হয়। ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বা মুক্তিলাভ করার পর ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়া যায়। তাই অপ্রাকৃত প্রেমময়ী ভগবৎ-সেবাই হচ্ছে জীবনের পরম লক্ষ্য, এবং স্বল্পক্ষণ মথুরামণ্ডলে বাস করলে তা অনায়াসে লাভ করা যায়।''
আমি পরিবার সহ মাঝে মাঝে ধামে গিয়ে কিছুদিন বাস করি।
উপসংহার :
ভক্তির এই অঙ্গগুলি পালন করার মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি এগুলি আমাদের কৃষ্ণভাবনায় উন্নতির পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক। তাই এই অঙ্গগুলি পালন করা ভক্তি লাভের আকাঙ্খী প্রত্যেক ব্যক্তির আবশ্যক।
সমাপ্ত! হরে কৃষ্ণ!
প্রশ্ন (৩): যেই কারণে শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিরসামৃত সিন্ধু প্রণয়ন করেছেন, তা প্রস্তাবনায় প্রকাশ করেছেন; সেই কারণগুলি লিপিবদ্ধ করুন। কিভাবে এই কারণগুলি আপনার ক্ষেত্রে এবং বৃহত্তর সমাজের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তা আলােচনা করুন।
উত্তর:
প্রভুপাদের ভক্তিরসামৃত সিন্ধু প্রণয়নের কারণ :
১) প্রভুপাদ তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রচারে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন।
২) শ্রীল রূপ গোস্বামীর সংস্কৃত ভাষায় প্রণীত এই গ্রন্থটি যাতে সবাই বুঝতে পারে তাই তিনি ইংরেজি তথা বিভিন্ন ভাষায় ইহার সংকলন করেন।
৩) ভগবদ ভক্ত ও নির্বিশেষবাদীদের পার্থক্য নিরুপন করেছেন এবং ভগবদ ভক্তরা শ্রেষ্ঠ তা প্রমান করেছেন।
৪) যারা ভগবদ ভক্তির বিরধিতা করেন বিভিন্ন যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে তাদের উপেক্ষা করে সঠিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপনা করা।
৫) শ্রীল রূপ গোস্বামী কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রচার করার জন্য নিজেকে অযোগ্য মনে করতেন; শ্রীল প্রভুপাদ এই মনোভাব নিয়েই প্রচারকদের প্রচার করার উপদেশ দিয়েছেন।
৬) শুদ্ধ ভক্তি কিভাবে সকাম কর্ম ও মনধর্মপ্রসূত জ্ঞান থেকে আলাদা তা বোঝাতে চেয়েছেন।
৭) শুদ্ধ ভক্তি অলস ব্যক্তিদের কার্যকলাপ নয় বা মৌনী ধ্যানীদের মতো নিষ্ক্রিয়তা নয় তা প্রমান করেছেন।
৮) কৃষ্ণভক্তির অনুশীলন করার ক্ষেত্রে সদগুরুর কাছে দীক্ষা প্রাপ্ত হওয়ার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন।
৯) সাধারণ জীব ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তির অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু মহাভাগবত সর্বদা পরা শক্তির অধীনে থাকেন, এই সিদ্ধান্ত উপস্থাপনা করেছেন।
১০) শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টি বিধানের অনুকূল কার্য করাই প্রকৃত ভক্তি, অন্য সবকিছু যা অনুকূল নয় তা পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
১১) মায়াবাদীদের ভ্রান্ত মতবাদ, যেমন শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম থাকলেও কুরুক্ষেত্রের মাহাত্ম নেই, এই সব খণ্ডন করেছেন।
১২) বৈদিক কর্মকান্ডের প্রতি আসক্ত মানুষ যারা শ্রীকৃষ্ণকে পরম ভোক্তা বলে জানেন না তারা আসলে কৃষ্ণভক্তির প্রতিকূল কাজ করছেন, এই সিদ্ধান্ত বুঝিয়েছেন।
১৩) শ্রীল রূপ গোস্বামীর মতবাদ -- অপ্রতিহত ভাবে, অনুকূলভাবে, মনধর্ম প্রসূত জ্ঞান থেকে মুক্ত হয়ে, সকাম কর্ম রহিত, সমস্ত উপাধি বর্জন করে কৃষ্ণভক্তির অনুশীলন করার উপদেশ দিয়েছেন।
১৪) নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের সাথে নিত্য সম্পর্কযুক্ত অনুভব করে, পরিবার বা রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করে সময় নষ্ট না করে, সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করাই শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তি যোগ; এগুলি বিশ্লেষণ করেছেন।
১৫) সর্বোপরি জড় জগতের অন্ধকারে নিমজ্জিত অধঃপতিত জীবের উদ্ধার করার জন্য তিনি এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।
আমার ব্যাক্তিগত ক্ষেত্রে এই কারণ গুলির প্রাসঙ্গিকতা :
১) কৃষ্ণভক্তি অনুশীলন করার মার্গে গুরু ও পূর্বতন আচার্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি বজায়রাখার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছি।
২) প্রকৃত শুদ্ধভক্তি কি তা জানতে পেরেছি যা আমার নিজের অনুশীলন ও প্রচার করার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করবে।
৩) শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তিই জীবনের প্রকৃত প্রয়োজনীতা তা অনুভব করতে পেরেছি।
৪) বিভিন্ন উপাধি লাভের আকাঙ্খা না করে নিস্কলুষ কৃষ্ণভক্তি করতে হবে তা বুঝতে পেরেছি।
৫) অলসতার শিকার না হয়ে কৃষ্ণভক্তির অনুকূল কার্য করতে হবে, তা জানতে পেরেছি।
বৃহত্তর সমাজের ক্ষেত্রে এই কারণ গুলির প্রাসঙ্গিকতা :
১) কৃষ্ণ ভক্তি জীবনের পরম উদ্দেশ্য এটি প্রত্যেকে উপলব্ধি করলে সমাজের মধ্যে এক ভ্রাতৃত্ব বোধ জাগ্রত হবে। তখন সমাজে ভেদাভেদ, অশান্তি, দাঙ্গা, উপদ্রব ইত্যাদি সমাপ্ত হবে।
২) সমাজের বৃহত্তর অংশ যারা কর্মকান্ড করে থাকেন তারা শুদ্ধ ভক্তি লাভ করবেন।
৩) চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন যে এই কলিযুগের একমাত্র পন্থা ভগবদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তা সকলে জানতে পারবে।
৪) মায়াবাদ, নির্বিশেষবাদ, শূন্যবাদ ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তি লাভ করবে।
৫) সাধারণ মানুষ মনধর্ম প্রসূত জ্ঞান, দার্শনিকদের ভ্রান্ত মতবাদ দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রাখা পাবে।
৬) সমাজে এক নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে যেখানে প্রত্যেকে একেঅপরকে শ্রদ্ধা করবে।
৭) কৃষ্ণভক্তি সম্বন্ধীয় ভ্রান্ত ধারণাগুলি মানুষের মন থেকে দূর হবে।
উপসংহার :
প্রভুদের ভক্তিরসামৃত সিন্ধু গন্থটি প্রণয়নের কারণগুলি থেকে জানা যায় শুদ্ধভক্তির লক্ষণ গুলি কি কি এবং স্বয়ং প্রভুপাদ যে প্রকৃত শুদ্ধ ভক্ত ছিলেন তা আমরা অনুভব করতে পারি। আমাদের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা হল এই সমস্ত শুদ্ধভক্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা।