Bhakti Shastri Answer : ভগবদগীতা (2)
প্রশ্ন: জড়া প্রকৃতির গুনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার আচরণ গুলিকে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে তা নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করুন। ভগবদগীতার ১৭ অধ্যায়ের ১-৩ নং শ্লোক গুলি ও তাৎপর্য থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করুন।
উত্তর:
প্রথম ভাগ :
সত্ত্বগুণের ভিত্তিতে :
দেবতাদের পূজা: সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত ব্যাক্তিরা সাধারণত বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করে থাকেন। যেমন শিব, দূর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, গণেশ ইত্যাদি। তাদের নিজ নিজ শ্রদ্ধা অনুসারে কোনো বিশেষ দেবতার পূজা করেন। সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত নির্বিশেষবাদীরাও পাঁচ রকমের দেব-দেবীর পূজা করে থাকে।
তুলসী পূজা: প্রত্যেক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তুলসী দেবীর পূজা করেন।
গঙ্গা দেবীর পূজা: গঙ্গা দেবীর আরতি করা, গঙ্গা স্নান করা, গঙ্গা জল দিয়ে আচমন করা, গঙ্গায় অস্থি বিসর্জন করা ইত্যাদি আচার গুলি সাত্ত্বিক।
বাস্তু পূজা: গৃহ নির্মাণের পূর্বে বা কোনো মন্দির নির্মাণের পূর্বে বাস্তু পূজা সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা করে থাকেন।
সদগুরুদেবের পূজা: সদ্গুরুদেবের পূজা করা প্রত্যেক শিষ্যের কর্তব্য।
সত্ত্বগুণী যজ্ঞানুষ্ঠান: ফলের আকাঙ্খা রহিত যজ্ঞানুষ্ঠান করা সাত্ত্বিক।
গো পূজা : গো মাতার সেবা করা বা তার পূজা করা ইত্যাদি।
রজোগুণের ভিত্তিতে :
যক্ষ বা রাক্ষসের পূজা : রজোগুণে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা রাক্ষস প্রবৃত্তির কোনো শক্তিশালী ব্যাক্তির পূজা করেন। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু লোক হিটলারের পুজো করতে শুরু করেন। এরা মনে করেন যে যেকোনো লোককেই পূজা করা যায় আর তাতে একই ফল লাভ হয়।
রজোগুণী যজ্ঞানুষ্ঠান : ফলের কামনা করে যজ্ঞানুষ্ঠান করা হলো রাজসিক।
অনশন করা : অনেক সময় জাগতিক ফল লাভ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কিছু লোক কঠিন তপস্যা বা অনশন করা শুরু করে যা শাস্ত্র বিরুদ্ধ। রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত এই ধরণের আসুরিক ব্যক্তিরা কোনো পারমার্থিক উন্নতি সাধন করতে পারেন না।
জনপ্রিয় অভিনেতার পূজা: কিছু লোক তাদের প্রিয় অভিনেতা যার থেকে তারা নিকৃষ্ট ইন্দ্রিয় সুখ লাভ করে সিনেমা দেখার মাধ্যমে তার পূজা করে থাকে। যেমন বর্তমান সময়ে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান আদিদের মন্দির বানিয়ে তাদের পূজা করতে দেখা যায়।
সাধারণ ব্যক্তিকে ভগবানের অবতার জ্ঞানে পূজা করা: শাস্ত্রের কোনো প্রমাণ ছাড়াই কোনো কোনো ব্যক্তিকে কিছু লোক ভগবানের অবতার বলে পূজা করে। যা পারমার্থিক উন্নতির অনুকূল নয় বরং প্রতিকূল। এটি অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে কিছু লোকের দ্বারা করা হয়।
গুরুকে ভগবান ভেবে পূজা করা : অজ্ঞানতার কারণে কিছু জনপ্রিয় ব্যক্তিরা তাদের তথাকথিত গুরুকে ভগবান ভাবতে শুরু করে এবং তার প্রচার করে। ফলে সাধারণ মানুষ সেই অসদগুরুকে রামকৃষ্ণের অবতার ভেবে পূজা করতে থাকে।
যাদুকরকে ভগবান ভেবে পূজা: ভারতবর্ষে এক জাদুকর কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করে হাতে ছাইভস্ম, আপেল ইত্যাদি প্রকট করতো। এই সমস্ত কার্যকলাপ দেখে কিছু লোক তাকে ভগবান ভেবে তার পূজা করে এবং তার নামের সাথে রামের নাম যোগ করে, এই ভেবে যে সে রাম থেকে অভিন্ন।
ক্রিকেটারের পূজা: কিছু লোক জনপ্রিয় ক্রিকেটার যেমন সচিন তেন্ডুলকার এর পূজা করে।
কর্ম কে ধর্ম জ্ঞানে পূজা : বর্তমান সময়ে অনেক কর্মীব্যক্তি তাদের কর্ম করাকে আসল ধর্ম পালন বা পূজা করা বলে মনে করে।
ভগবানকে উপেক্ষা করে জীবের পূজা: কিছু লোক মনে করে জীবের সেবাই আসল ভগবানের পূজা করা। তাই তারা ভগবানকে উপেক্ষা করে অসুস্থ রোগীর সেবা, দরিদ্র মানুষকে বস্ত্রদান করা, পশুর সেবা করা যেমন কুকুর আদিকে খাওয়ানো ইত্যাদি করে থাকে।
জন্মদিন পালন : নিজের বা প্রিয়জনের জন্মদিন পালন করে নিজের অহংকারকে সন্তুষ্টি প্রদান করার প্রচলন বর্তমানে ব্যাপক পরিমানে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তমোগুণের ভিত্তিতে :
ভূত ও প্রেতাত্মাদের পূজা : তমোগুণে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ভুত ও প্রেতাত্মাদের পূজা করে। যেমন কিছু লোক মৃত ব্যক্তির সমাধিতে গিয়ে পূজা করে। আবার গ্রামাঞ্চলে কিছু লোক যদি জানতে পারে যে জঙ্গলে কোন গাছে ভুত আছে হলে তারা সেখানে নৈবেদ্য অর্পণ করে সেই গাছের পূজা করে।
তামসিক যজ্ঞানুষ্ঠান : শাস্ত্রবিধি বর্জিত, মন্ত্রহীন, শ্রদ্ধারোহিত মনগড়া যোগগনুষ্ঠান তামসিক।
মনগড়া ধর্মপালন : কিছু ধর্মপ্রচারক সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন এই বলে যে তারা নিজের খেয়াল মতো পূজা অর্চনা করতে পারে কোনো শাস্ত্র বিধি পালন না করে। তারা বলেন তোমাদের আত্মা যা চাই তাই খাবে যেমন মাছ, মাংস, ডিম তার সাথে সাথে তুমি বিভিন্ন পূজাও করতে পারবে।
আমিষ ভক্ষণের উদ্দেশ্যে কালীপূজা: বর্তমানে কালীপুজোর প্রচলন অত্যাধিক পরিমানে বর্ধিত হয়েছে। এর কারণ সাধারণ মানুষ মনে করে কালী দেবী মাংসাহার করেন আর তাই তাঁকে ছাগল, পাঁঠা ইত্যাদির বলি দিয়ে অর্পণ করা যায়। আর সেই তথাকথিত প্রসাদ তারা ভক্ষণ করতে পারবে।
তন্ত্রসাধনা: বিভিন্ন শ্মশানে কিছ তান্ত্রিক মরা মানুষের হাড়, মাংস, মৃত পশুর রক্ত ইত্যাদি খেয়ে তন্ত্র সাধনা করে থাকে। তারা মনে করে এভাবে তারা অলৌকিক শক্তি লাভ করবে।
পশুর পূজা : কিছু লোক সাপ, কুকুর ইত্যাদিকে উপাস্য মনে করে তাদের পূজা করে থাকে তাদের অজ্ঞানতার বশে।
যৌনতা বা নেশার পূজা : কিছু নিকৃষ্ট লোক মনে করে যে সম্ভোগের মাধ্যমে সমাধি লাভ করা যায়। এই কারণে তারা যৌনতা ও নেশাকে মাধ্যম করে কিভাবে চরম সুখ লাভ করা যায় তার নিত্যনূতন পন্থা সৃষ্টি করতে থাকে। যাতে তারা কখনোই সফল হয় না।
ভাদু পূজা : এটি গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়। কিছু লোক ভাদু নামক এক রাজকুমারীর গুণগান করে থাকে গান গাওয়ার মাধ্যমে।
পাথর বা গাছের পূজা : কোনো পাথরকে শিবলিঙ্গ বা অন্য কোনো দেবতা ভেবে পূজা করা অথবা বট গাছ আদিকে পূজা করা তমোগুণের লক্ষণ।
দ্বিতীয় ভাগ:--
উদ্ধৃতি ১) প্রভুপাদ ১৭.২ শ্লোকের তাৎপর্যে বলেছেন যে মানুষ তাদের পূর্বকৃত সত্ত্বগুণ, রজোগুণ অথবা তমোগুণাশ্রিত কর্ম অনুসারে তারা বিশেষ ধরণের প্রকৃতি অর্জন করে। প্রকৃতির বিভিন্ন গুণাবলীর সঙ্গে জীবের অসঙ্গ চিরকাল ধরেই চলেছে ; যেহেতু জীবসত্তা জড়া প্রকৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে, সেই জন্য জড় গুণের সঙ্গে তার আসঙ্গ অনুসারে সে বিভিন্ন ধরণের মানসিকতা অর্জন করে থাকে।
উদ্ধৃতি ২) প্রভুপাদ ১৭.৩ শ্লোকের তাৎপর্য বলেছেন যে প্রতিটি মানুষেরই, সে যেই হোক না কেন, কোনো বিশেষ ধরনের শ্রদ্ধা থাকে। কিন্তু তার স্বভাব অনুসারে সেই শ্রদ্ধা সাত্ত্বিক, রাজসিক অথবা তামসিক হয়। এভাবেই তার বিশেষ শ্রদ্ধা অনুসারে সে এক-এক ধরনের মানুষের সঙ্গ করে।
উদ্ধৃতি ৩) প্রভুপাদ ১৭.৩ শ্লোকের তাৎপর্য বলেছেন যে শ্রদ্ধা অর্থাৎ বিশ্বাস কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রদ্ধা অর্থাৎ বিশ্বাসের প্রথম উদয় হয় সত্ত্বগুণের মাধ্যমে। কারও শ্রদ্ধা দেবদেবীর প্রতি অথবা মনগড়া কোন ভগবান কিংবা কোন রকম অলীক কল্পনার প্রতি থাকতে পারে। এই যে সুদৃঢ় হোক বিশ্বাস, তা জগতের সত্ত্বগুণের কর্ম থেকে উদ্ভূত। কিন্তু জড়-জাগতিক বদ্ধ জীবনে কোনো কাজই পরিপূর্ণভাবে পরিশুদ্ধ নয়। সেগুলি হয় মিশ্র প্রকৃতির।
উদ্ধৃতি ৪) প্রভুপাদ ১৭.৩ শ্লোকের তাৎপর্য বলেছেন যে কারও হৃদয় যদি সত্ত্বগুণের দ্বারা প্রভাবিত থাকে, তাহলে তার শ্রদ্ধা হবে সাত্ত্বিক। তার হৃদয় যদি রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত থাকে, তাহলে তার শ্রদ্ধা হবে রাজসিক এবং তার হৃদয় যদি তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত থাকে বা মোহাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে তার শ্রদ্ধাও হবে সেই রকমই কলুষিত।
উপসংহার ১) যদি কেউ কোন সদ্গুরুর সঙ্গ লাভ করে এবং তাঁর নির্দেশিত অনুশাসন আদি ও শাস্ত্রাদি মেনে চলে তাহলে তার প্রকৃতি বদলাতে পারা যায়।
উপসংহার ২) কেউ যদি আত্মজ্ঞান লাভের পন্থা অবলম্বন না করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিচালিত হবেন।